পার্বত্য শান্তিচুক্তি ও পাহাড়ের উন্নয়ন

মাসুজ পারভেজ চৌধুরী

by bdnewsinsider

১৯৭১ সালে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্বাধীনতা পেয়েছিলাম আমরা। এরপর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি সবেমাত্র সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়। একই সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে শুরু হয় অন্য একটি ষড়যন্ত্র। সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের কাছে বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার বাহানায় সেখানে সৃষ্টি হয় ‘শান্তিবাহিনী’। তখন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ক্রমেই অশান্ত হয়ে পড়ে। একসময় অরক্ষিত সীমান্তসহ ভূখণ্ড রক্ষা ও শান্তি ফেরাতে সেখানে মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী।

এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসে সরকার গঠন করে, কিন্তু পাহাড়ের সমস্যা আর সমাধান হয় না। এভাবে কেটে যায় প্রায় দুই যুগ। ১৯৯৬ সালে সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে দেশের সরকার গঠন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর তারা পার্বত্য জেলাগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে এগোতে থাকে। তারা দফায় দফায় বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনা শুরু করে শান্তিবাহিনীর সঙ্গে। এরই ফলে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন যথাযথ অনুসরণ করে কোনো তৃতীয় পক্ষের সহায়তা ছাড়াই পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সই হয়।

দুই যুগের কালো অধ্যায় শেষে শান্তিচুক্তির মধ্য দিয়ে আলো ফেরে পাহাড়ে। ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে পরিবেশ। পাল্টাতে থাকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চিত্রও। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি সরকারের ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নানা যুগোপযোগী সিদ্ধান্তের কারণে পর্যটনেও ভূমিকা রাখতে শুরু করে পাহাড়।

সরকার গত ২৫ বছরে শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করেছে। চুক্তির অবশিষ্ট ১৫টি ধারা আংশিক এবং ৯টি ধারার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। শান্তিচুক্তির আংশিক ও অবাস্তবায়িত ধারাগুলোর বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

চুক্তি অনুযায়ী সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করেছে এবং স্থানীয় সরকার পরিষদকে জেলা পরিষদে রূপ দিয়ে পাহাড়ের অভূতপূর্ব উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। এ ছাড়া ‘তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ’ এবং নিয়ন্ত্রণাধীন ৩৩টি দপ্তর-সংস্থার মধ্যে রাঙামাটিতে ৩০টি, খাগড়াছড়িতে ৩০টি এবং বান্দরবানে ২৮টি হস্তান্তর করা হয়েছে। ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি করতে গঠন করা হয়েছে ভূমি কমিশন। প্রত্যাগত ১২ হাজার ২২৩টি উপজাতি শরণার্থী পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। শান্তিবাহিনীর সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা এবং ৭২৫ জনকে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। একটি পদাতিক ব্রিগেডসহ ২৩৮টি নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বিল-২০১০ জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরে চাকরির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের নির্ধারিত কোটা অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা উপেক্ষা করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য কোটা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের শীর্ষস্থানীয় পদে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্য থেকে প্রতিনিধি নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের সংসদ সদস্যকে প্রতিমন্ত্রী সমমর্যাদায় নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। ১৯৯৮ সালে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়েছে। ১৯৭৬ সালে জারীকৃত পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড অধ্যাদেশ বাতিল করে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন, ২০১৪ জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে।

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে আর্থসামাজিকভাবেও অনেক উন্নয়ন হয়েছে। ভূমিবিষয়ক আইন ও বিধিমালা ছিল না। এখন ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি আইন, ২০০১ প্রণয়ন এবং ২০১৬ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়েছে, যা চলমান রয়েছে। শান্তিচুক্তির আগে যেখানে এডিপিভুক্ত প্রকল্প ছিল মাত্র একটি, এখন সেখানে ১৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন বাজেট দেয়া হয় ৯১৫ দশমিক ৮৩ কোটি টাকা, আগে (১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে) যা ছিল ৫০ দশমিক ৫৭ কোটি টাকা। ঢাকার বেইলি রোডে ১ দশমিক ৯৪ একর জমির ওপর ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স। চুক্তির পর পার্বত্য অঞ্চলের জেলাগুলোয় স্বাস্থ্য খাতে দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা বিস্তারে সরকারের অবদান অনস্বীকার্য। চুক্তির আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুবই কম ছিল। চুক্তির পর দুই শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিবছর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪০০ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ছাত্রছাত্রী বিশেষ কোটায় ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। পাবলিক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এর সংখ্যা আরও বাড়ানো হয়েছে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও বিশেষ কোটার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টেকনিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজও।

একসময় পাহাড়ের শিক্ষার্থীরা কলেজ-ভার্সিটিতে পড়ার জন্য নানা প্রতিকূলতা জয় করে সমতলে আসত। তাদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ ছিল না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন। দুর্গম হিসেবে পরিচিত বসতিতেও প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা পড়ছে নিজের মাতৃভাষায়।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারের তরফ থেকে তিন পার্বত্য জেলায় ৮৭৯ দশমিক ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। চুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে তিন জেলায় এ পর্যন্ত ২ হাজার ৮৯৯ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব নয়, এ রকম লক্ষাধিক পরিবারকে এ পর্যন্ত ধাপে ধাপে সৌরবিদ্যুৎ সুবিধা প্রদানের জন্য একটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে; শান্তিচুক্তির আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল না। চুক্তির সুফল হিসেবে রাতের আঁধারেও দুর্গম পাহাড়ের কুঁড়েঘরগুলোতে জ্বলছে সোলারের বাতি।

চুক্তির আগে পার্বত্য অঞ্চলে মাত্র ২০০ কিলোমিটার রাস্তা ছিল। বান্দরবানের রুমা ও থানচি উপজেলার সাঙ্গু নদীর ওপর কোনো সেতু ছিল না। এখন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রাস্তা ও বিভিন্ন আকারের সেতু-কালভার্ট নির্মাণ করছে। চুক্তির পর ১ হাজার ৫৩২ কিলোমিটার পাকা রাস্তা ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এর বাইরে প্রায় ৮৬০ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।

একটা সময় পাহাড়ি সড়কে একমাত্র ভরসা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ অস্থায়ী বেইলি সেতু। এতে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটত। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে অনেক কিছু। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর খাগড়াছড়ির অধিকাংশ পাটাতনের বেইলি সেতু সরিয়ে নির্মাণ করা হয় স্থায়ী সেতু। অতিসম্প্রতি শুধু খাগড়াছড়ি জেলাতেই ৪২টি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এতে পরিবর্তন আসবে খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগে।

শান্তিচুক্তি সইয়ের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে টেলিযোগাযোগ, মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কের আওতা বৃদ্ধি এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করা হয়েছে, যা চুক্তির আগে ছিল না বললেই চলে। ইন্টারনেট ব্যবস্থার উন্নয়নে মোবাইল অপারেটরগুলোর পাশাপাশি পাহাড়ে ব্রডব্যান্ড ওয়াইফাইয়ের বিস্তারও ঘটেছে। এ ছাড়া নেটওয়ার্কের জটিলতা নিরসন করে পাহাড়ের আনাছে-কানাছে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ দিয়েছে সরকারি টেলিকম কোম্পানি টেলিটক।

পূর্বাঞ্চলীয় সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রদর্শনীক্ষেত্র স্থাপন কার্যক্রম এবং চাষি পর্যায়ে উন্নত মানের ধান-গম ও পাটবীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্পের আওতায় প্রদর্শনীক্ষেত্র স্থাপনকাজ চলমান রয়েছে। কৃষিব্যবস্থার উন্নয়নে পাহাড়ে কৃষি বিভাগের মাধ্যমে মধু, কফি, আম, কমলাসহ নানা অর্থকরী ফসল আবাদ হচ্ছে। ইতিমধ্যেই যা প্রতিবছর সমতলে, এমনকি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সাল থেকে উপজাতিদের নিজস্ব পাঠ্যপুস্তকের আওতায় শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া পাহাড়িদের ভাষা সংরক্ষণে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে সাতটি শব্দকোষ প্রকাশ করা হয়েছে।

পর্যটনের জন্য পার্বত্য ভূখণ্ড বরাবরই আকর্ষণীয়। যোগাযোগ ও আবাসন সুবিধা পর্যাপ্ত না থাকায় এ সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছিল না। এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। পর্যটনের অবকাঠামো গড়ে উঠছে। শেখ হাসিনা সরকারের আহ্বানে তিন পার্বত্য জেলার পর্যটনশিল্পকে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যে সেনাবাহিনী কাজ করছে। পার্বত্য জেলা শহর, নদী, সর্পিল রাস্তা, পাহাড় ও সবুজে ঘেরা সারি সারি গাছ, পাহাড়ের গুহা, ঝরনা, বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যময় সংস্কৃতি, জীবনধারা ও বিনোদনের জন্য পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে সড়কপথ ও অন্যান্য অবকাঠামোর উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে। রাত যাপনের সুবিধা তৈরি হওয়ায় এখন হাজার হাজার সৌন্দর্য-পিপাসু মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন দুর্গম স্থানে ভ্রমণ করার সুযোগ পাচ্ছেন।

পার্বত্য জেলার সদর হাসপাতালগুলোতে প্রায় সব ধরনের চিকিৎসাসেবাই দেয়া হয়, যা সাধারণত সমতলের জেলাগুলোর হাসপাতালে দেয়া হয়। স্বতন্ত্র কোভিড ইউনিটে কোভিড রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হয়। এর বাইরে দুর্গম এলাকাগুলোতে নিয়মিত চক্ষুসেবা ক্যাম্প, মেডিকেল ক্যাম্পেইনসহ নানাভাবে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে সেনাবাহিনী। সম্প্রতি করোনার টিকা প্রদান কার্যক্রমে নিজেদের হেলিকপ্টার ব্যবহার করে পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় পাহাড়িদের টিকা দিয়ে অভাবনীয় প্রসংশা কুড়িয়েছে সেনাবাহিনী।

শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে সরকার ও সেখানকার আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কমে এসেছে চাঁদাবাজি। বেড়েছে পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রীতি। আগে যেখানে দিনে-দুপুরে গাড়ি থামিয়ে, ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে, অপহরণ করে বিরাট অঙ্কের চাঁদাবাজি হতো, সেখানে তা এখন প্রায় নেই বললেই চলে। একটা সময় ছিল, পাহাড়ি সড়কে বেলা ৩টার পর কোনো যানবাহন চলাচল করত না সন্ত্রাসীদের ভয়ে, সেখানে এখন ২৪ ঘণ্টাই বিলাসবহুল গাড়ি চলাচল করছে, যা শান্তিচুক্তির অভাবনীয় সাফল্য।

শান্তিচুক্তির ২৫ বছরে এসে কী পরিবর্তন হলো পাহাড়ের? জানতে চেয়েছিলাম কয়েকজনের কাছে। কেউ বলছেন, বান্দরবান এলাকায় নির্মিত বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ৭২ কিলোমিটার সড়কের কথা। কেউ বলছেন, মেডিকেল কলেজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় জনপ্রত্যাশা পূরণ করেছে। তবে সাধারণ মানুষ বলতে চাইছেন, পার্বত্য ভূখণ্ডে এমন অনেক দুর্গম এলাকা রয়েছে, যেখানে পাকা সড়ক নির্মাণ কখনো হবে- এমনটি ভাবনায় আসত না। তবে এখন তা বাস্তব। মিজোরাম সীমান্ত পর্যন্ত নির্মিত সীমান্ত-সড়কের কথাও বলছেন অনেকে। কেউ বলেন, বিদ্যুৎ সংযোগ ও মোবাইল-ইন্টারনেট সেবার কথা।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রশংসা শুনতে পাই। পাশাপাশি চুক্তির ২৫ বছরে এসে পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলবে, এটা অনেকের ভাবনায় না এলেও আজ তা বাস্তবতা। চুক্তি এবং এর বাস্তবায়ন নিয়ে শুরুতে উপকারভোগীদের মধ্যে কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও এ কথা অনস্বীকার্য যে পাহাড়ি-বাঙালি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করে দিন দিন উন্নয়ন বিকশিত হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফেরাতে শেখ হাসিনা সরকারের প্রচেষ্টায় শান্তিচুক্তি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে সবাই একযোগে কাজ করতে পারলে শান্তির পথ আরও সুগম হবে।

লেখক: লে. কর্নেল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

একই লেখা

Leave a Comment