রাজনীতির নতুন মডেল; বিএনপির অর্থ উপার্জনের ‘সৃজনশীল’ পদ্ধতি

লিখেছেন আবদুল মান্নান

by bdnewsinsider

সার্বিক বিচারে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি মডেল নামক একটি নতুন মডেল সৃষ্টি হয়েছে, যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য রাজনীতি মানে একটি দলকে সব সময় ক্ষমতায় থাকতে হবে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যার তিন মাসের কম সময় পর জিয়াউর রহমান নিজেই ক্ষমতা দখল করেন আর সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার ক্ষমতা নিরঙ্কুশ ও চিরস্থায়ী করার জন্য সেনা গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় বিএনপি নামক একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। জিয়া শুরুতেই দেশের রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের প্রতি এতই বীতশ্রদ্ধ ছিলেন যে তা উৎকটভাবে প্রকাশ পায় তারই ‘আমি রাজনীতিবিদের জন্য রাজনীতি কঠিন করে দেব’—এই বক্তব্যে। জিয়ার এ দর্শন পরবর্তীকালে তার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির জন্য অভিশাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুরুতে জিয়া কিছু স্বাধীনতাবিরোধী ও পরিত্যক্ত আওয়ামী লীগ নেতা যেমন শাহ আজিজ, শাহ মোয়াজ্জেম, মশিউর রহমান বা অলি আহাদের মতো রাজনীতিবিদদের তার দলে ভেড়াতে পারলেও পরবর্তীকালে তারা সবাই নানা কারণে দল থেকে হারিয়ে যান বা স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন। তাদের স্থানে দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে যারা সমবেত হন তাদের অধিকাংশই পেশাজীবী বা সামরিক-বেসামরিক আমলা। অনেকটা এ কারণেই বিএনপি বিশেষ করে দলের জন্য কোনো রাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

এক-এগারোর পর বেগম জিয়া যখন গ্রেপ্তার হলেন তখন বিএনপির বেহালদশা। কে যে কখন দলের সভাপতি হচ্ছেন আর কে যে কখন দল থেকে বহিষ্কার হচ্ছেন বোঝা কঠিন হয়ে গিয়েছিল। বেগম জিয়া গ্রেপ্তার হলেও তাদের বেশিরভাগ নেতাই নিরাপদ ছিলেন। অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই গ্রেপ্তার করার পর পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় নেতাকে কারারুদ্ধ করা হয়। দলের এ ক্রান্তিকালে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন প্রেসিডিয়াম সদস্য জিল্লুর রহমান। সেই যে বিএনপির এক নিরুদ্দেশযাত্রা তা থেকে দলটি আর ফিরতে পারেনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন নেতা হিসেবে তারা বঙ্গবন্ধুর ছায়াতলে বেড়ে ওঠা ড. কামাল হোসেনকে ধার করে। ড. কামাল হোসেন নিঃসন্দেহে তার পেশায় অত্যন্ত সফল একজন মানুষ কিন্তু তার রাজনৈতিক জীবন বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে শুরু আর বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরই শেষ। সেই মানুষটিকে কেন বিএনপি তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বেছে নিয়েছিল তা-ও এক রহস্য। ড. কামাল হোসেন হয়তো বুঝতে পারেননি তাকে সামনে রেখে তারেক রহমান লন্ডনে বসে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত ছিলেন। বিএনপির জন্য এ নির্বাচনে যাওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। কারণ নির্বাচনে অংশ না নিলে নির্বাচন কমিশনে তাদের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যেত।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে বিএনপি ও তার মিত্ররা ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচন শুধু বয়কটই করেনি, তারা দাবি আদায়ের অজুহাতে সারা দেশে ভয়াবহ তাণ্ডব সৃষ্টি করে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দৃঢ়তা ও সাহসের কারণে সব বাধা উপেক্ষা করে সে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপি বাধ্য হয়েছিল এক তীব্র গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। এরশাদ পতনের পর বিএনপি ক্ষমতায় এসে অনিয়মতান্ত্রিক পথে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার জন্য যত রকমের অসদুপায় সম্ভব সবই অবলম্বন করেছিল। ১৯৯১ সালের নির্বাচন একটি নির্বাচনকালীন অস্থায়ী সরকার পরিচালনা করলেও তার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল না। গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচন, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারা সংযোজন, এক মাসের মাথায় সংসদ বাতিল তারপর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টির সমর্থনে দীর্ঘ ২১ বছর পর সরকার গঠন করে। দীর্ঘ ২১ বছর পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসা শেখ হাসিনা পাঁচ বছর মেয়াদকাল সুষ্ঠুভাবে শেষ করে শান্তিপূর্ণভাবে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। এবার নতুন করে শুরু হলো নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করার আর এক ষড়যন্ত্র। তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান যিনি শেখ হাসিনার শাসনামলে প্রধান বিচারপতি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন, সেই লতিফুর রহমানই তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন যেন আওয়ামী লীগ কোনো অবস্থায়ই ক্ষমতায় ফিরতে না পারে। এক বৈর পরিবেশে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছিল বটে তবে তারা সংসদ অধিবেশনে অংশ নিয়ে দায়িত্ব পালন করেছিল।

১৯৭৫ সালেও বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর জিয়া আওয়ামী লীগকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালের পাতানো নির্বাচনের আগে ঘোষণা করেছিলেন যেসব দল নির্বাচনে অংশ নিতে চায় তাদের নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হতে হবে। দল নিবন্ধনের কারিগর জিয়া। বঙ্গবন্ধুর সহচর ও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ও দলের সভাপতি আবদুল মালেক উকিল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে দল নিবন্ধন করতে গেলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়; কারণ প্রস্তুতকৃত কাগজপত্রে ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জয় বাংলা’র মতো শব্দ সংযোজিত ছিল; যা জিয়া অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন। সেসব দলিলপত্র পরিমার্জিত করে আবার দাখিল করা হয়েছিল। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দল ভাগ হয়ে এক গ্রুপ মিজান চৌধুরীর নেতৃত্বে মই মার্কা নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে দুটি আসনে জয়ী হয়েছিল। নির্বাচন শেষ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পর ফলাফল ঘোষণা করে বলা হয়, আওয়ামী লীগ ৩৯ আসনে ‘জয়ী’ হয়েছে। তার পরও আওয়ামী লীগ সংসদে যোগ দিয়েছিল। এরশাদ যখন ১৯৮৬ সালে আর একটি পাতানো সংসদ নির্বাচন করেন তাতে আওয়ামী লীগ অংশ নেয় যদিও তখন এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনকেও রাজনৈতিক আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে নেয়। এ নির্বাচনটিও ছিল জিয়ার ১৯৭৭ সালের জিয়ার নির্বাচনের অনুরূপ। আওয়ামী লীগকে ৭৬টি আসন ‘দেওয়া’ হয়। শুরু হয় সংসদের ভেতরেও এরশাদবিরোধী আন্দোলন। একপর্যায়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিরোধী দলের সব সংসদ সদস্য পদত্যাগ করেন। ১৯৮৮ সালে এরশাদ অচল সংসদ ভেঙে দিয়ে আবার সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দিলে সব প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল সে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। এরশাদের মদদে গড়ে ওঠে ৭৬ দলের এক রাজনৈতিক মোর্চা। নেতৃত্বে ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের রাজপথ কাঁপানো ছাত্রনেতা আ স ম আবদুর রব। সে সময়ই ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ শব্দ কটির জন্ম। সে নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি ২৫১ আসন নিয়ে গৃহপালিত মোর্চাকে ১৯টি আসন ধরিয়ে দিয়েছিল।

তারপর ১৯৯০ সালে এরশাদের পতন আর ১৯৯১ সালে নির্বাচন। আওয়ামী লীগ কখন নির্বাচন করতে হবে আর কখন হবে না তা বুঝতে পারে এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারে কারণ আওয়ামী লীগ তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রপ্ত করেছে। বিএনপি নিতে ব্যর্থ হয় তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের দূরদর্শিতার অভাবে। তারা বুঝতে অক্ষম একটি রাজনৈতিক দল কোনো বহুজাতিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান নয় যে তাকে হাজার মাইল দূর হতে পরিচালনা করা যায়। যার নির্দেশে তাদের দল পরিচালিত হয় তিনি শুধু হাজার মাইল দূরেই অবস্থান করেন না, অবস্থানের স্থানটি চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা (শীতকালে) দূরত্বে। কোনো জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে হলে এ সময়ের ব্যবধানের কারণে সময়মতো নেওয়া সম্ভব হয় না। কেউ কেউ অতি উচ্ছ্বাসে বলে ফেলেন, ভিয়েতনামের হো চি মিন বা ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনি যদি বিদেশ থেকে নিজ দেশে আন্দোলন সফল করতে পারেন তাহলে তাদের নেতা কেন পারবেন না? এ নাদানরা তাদের নেতার সঙ্গে এই নেতাদের পার্থক্য বুঝতে অক্ষম।

বিএনপি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ স্থানীয় পর্যায়ের অনেক নেতা অংশ নিয়েছেন, নিচ্ছেন। বিভিন্ন কেন্দ্রে তাদের অসংখ্য কর্মীকেও ভোট দিতে দেখা গেছে। এখন দেশে স্থানীয় সরকার কাঠামোর অন্যতম স্তর উপজেলা নির্বাচন হচ্ছে। তা-ও বিএনপি বর্জন করছে, যদিও এটি কোনো জাতীয় নির্বাচন নয়। এ নির্বাচন সব সময় ক্ষমতাসীন দলের অধীনেই অনুষ্ঠিত হয়। দলের বর্জনের ডাক উপেক্ষা করে বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় পর্যায়ের অসংখ্য নেতা অংশ নিচ্ছেন এবং কয়েক জায়গায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতও হয়ে গেছেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণের ‘অপরাধে’ এ পর্যন্ত বিএনপি প্রায় দেড়শ স্থানীয় নেতাকে বহিষ্কার করেছে। এতে তো অন্য দলের কোনো ক্ষতি নেই, ক্ষতি বিএনপিরই। কারণ জাতীয় নির্বাচনের সময় এ তৃণমূল নেতাকর্মীরাই যেকোনো দলের জন্য নিয়ামক শক্তি। এমন একজন নেতার কাছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জানান, এ বহিষ্কার কোনো সমস্যা নয়; কারণ নির্বাচন শেষ হয়ে গেলে সবকিছু ম্যানেজ হয়ে যাবে! নির্বাচনে গেলেও অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন ম্যানেজ, বহিষ্কার হলেও একই পন্থায় আবার দলে প্রবেশ ম্যানেজ। অর্থ উপার্জনের বেশ সৃজনশীল পদ্ধতিই বলতে হয়!

বিএনপি কী করবে তা তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। তবে তারা অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিলে দেশের একটি সুষ্ঠু ধারার রাজনৈতিক দলে পরিণত হতে বা যেকোনো গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অবদান রাখতে পারে। কিন্তু বিএনপি তা কখনও হতে চায়নি। তারা সব সময় আচরণ করেছে একটি ক্লাবের মতো। কোনো কিছুর জন্ম বা প্রস্তুতির সময় ত্রুটিযুক্ত থাকলে তা ত্রুটিমুক্ত করা কঠিন। এত বছর পরও দল বুঝতে পারে না তাদের প্রধান সমস্যা দলের অদূরদর্শী নেতৃত্ব। দলে কর্মী আছেন অনেক। তারা নেতৃত্বের অক্ষমতার কারণে অনেকটা হতাশ। এই সঙ্গে যোগ হয়েছে তাদের ভ্রান্ত পথে পরিচালনা করার জন্য কিছু তামাদি বাম দল ও প্যাডসর্বস্ব স্বঘোষিত নেতা; যারা মনে করেন জাতীয় প্রেস ক্লাব ও নয়াপল্টনই বাংলাদেশ! সার্বিক বিচারে বলা যায়, বিএনপি ও তাদের মিত্ররা বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতায় আসবে তা অনেকটা স্বপ্নবিলাস। বলা যায়, তার জন্য ২০২৯ সালে অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বিএনপি মডেলের রাজনীতি দিয়ে এ মুহূর্তে এর বাইরে অন্য কিছু আশা করা কঠিন।

  • শিক্ষাবিদ, গবেষক। রাজনীতি-সমাজ বিশ্লেষক

একই লেখা

Leave a Comment