‘পার্বত্য চুক্তি হলেও আস্থা তৈরি হয়নি পাহাড়ে’

by bdnewsinsider

বান্দরবান এলাকায় এখনও শান্তি ফেরেনি। সেনাবাহিনী নিয়মিত অভিযান চালালেও মানুষের মধ্যে আতঙ্ক রয়েই গেছে। এমন অবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার সমাধান কেবল সামরিক বাহিনীর অভিযানে সম্ভব নয়। এর জন্য রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্টজনরা।

তারা বলেন, পাহাড়ি গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি তাদের আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা ভুলে গেলেও চলবে না।

তাদের মতে, সমস্যার সমাধানে দরকার ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং বর্তমান সময়ে পাহাড়ি গোষ্ঠীর অবস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য উপস্থাপন।

শনিবার রাজধানীর বনানীতে এডিটরস গিল্ড আয়োজিত ‘অশান্ত পাহাড়ি জনপদ: সহিংসতা বনাম সম্প্রীতি’ শীর্ষক আলোচনায় তারা এসব কথা বলেন।

গিল্ডের প্রেসিডিয়াম সদস্য ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্তের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরোপত্তা বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন, ইতিহাসবিদ ও রয়্যাল ইউনিভার্সিটি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মেজবাহ কামাল, মারমা রাজকুমার সুইচিং প্রু, বান্দরবান জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানজামা লুসাই, কক্সবাজার সিটি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক কে টি অং, মিয়ানমারে নিযুক্ত সাবেক কনস্যুলেট প্রধান ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) মো. এমদাদুল ইসলাম, চট্টপগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ, খাগড়াছড়ির পানছড়ি সকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সমীর দত্ত চাকমা।

বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের যে ১৩টি জনগোষ্ঠীর কথা বলা হয় তার মধ্যে কুকিচিন মাত্র এক শতাংশ। কিন্তু মিজোরাম-আরাকান মিলিয়ে তাদেরে আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে বড় প্রভাব রাখতে পারে।

সর্বোপরি কেন্দ্রীয় রাজনীতির সম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছাই পারে অশান্ত পার্বত্য জনপদকে শান্ত করতে; এমনটাই মনে করেন বক্তারা।

গত দুই এপ্রিল বান্দরবানের রুমা উপজেলার সোনালী ব্যাংকে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। সশস্ত্র সংগঠন কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) এর সশস্ত্র সদস্যরা ব্যাংকের নিয়োজিত গ্রাম পুলিশ ও ব্যারেকে থাকা আনসার সদস্যদের ১৪ টি অস্ত্র ও গুলি লুট করে নিয়ে যায়।

এছাড়াও ডাকাতির সময় ব্যাংক ম্যানেজার নেজামউদ্দিনকে অপহরণ করে নিয়ে যায় কেএনএফের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। পরে অভিযানে ব্যাংক ম্যানেজারকে উদ্ধার করা হয়। ওই সময় ব্যাংক সংলগ্নে অবস্থিত মসজিদে সশস্ত্র অবস্থায় প্রবেশ করে তারাবি নামাজ আদায়রত মুসল্লিদের জিম্মি করে মারধর করা হয়।

রুমায় সেনাবাহিনীর অভিযানে কেএনএফ সদস্য নিহতরুমায় সেনাবাহিনীর অভিযানে কেএনএফ সদস্য নিহত

পরের দিন তিন এপ্রিল দিন-দুপুরে উপজেলা থানচিতে কৃষি ও সোনালী ব্যাংকে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ওই সময় ১৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে যায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কেএনএফ এর সশস্ত্র সদস্যরা।

এ ঘটনায় রুমা ও থানচি থানায় একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। ব্যাংক ডাকাতি ও গোলাগুলির ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় যৌথবাহিনীর অভিযান চলছে।

বান্দরবান জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানাজামা লুসাই বলেন, সম্প্রতি যে ঘটনা ঘটেছে বান্দরবানে, এ রকম সহিংসতা আমরা এর আগে দেখিনি। বান্দরবানে যতগুলো গোষ্ঠী আছে, তার মধ্যে কুকিও নাই, চিনও নাই। তাহলে কী কারণে তারা এই সংগঠন করলো? আমার বোধগম্য নয়। নাথান বম যে আড়ালে থেকে এই কাজ করবে আমরা কখনও ভাবিনি। তাদের উদ্দেশ্য কী, সেটা বম বলতে পারবে। আমরা স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এটা নিয়ে ভাবি না। আমরা চাই পাহাড়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজমান থাক।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গোলটেবিল বৈঠকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখক, গবেষক ও শিক্ষক অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, তাদের আচরণের মধ্যে হটকারি ব্যাপার আছে, তা স্পষ্ট হলো। তারা যদি রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে এগোত, তাহলে জনসংহতি সমিতির আলোচনা উপেক্ষা করে অস্ত্রের দিকে যেতো না। তাদের জন্য ভালো হতো আলোচনা চালিয়ে যাওয়া এবং তারা যদি চাপ দিতে চায়, সেটাও রাখা। পাশের মিয়ানমারের নানা দিকে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছিল। ঠিক এই ধরনের একটি অবস্থায় বাংলাদেশের মতো এ রকম উন্নয়নশীল দেশে নানা সমস্যা চাপিয়ে দেওয়া হয় বাইরে থেকে। আমি এই ঘটনাকে স্থানীয় আঙ্গিকে না দেখার পক্ষে। আমাদের দেখতে হবে, বাইরে থেকে কোনও কিছু করা হচ্ছে কি না।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপদ বিশেষজ্ঞ ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পার্বত্য এলাকায় কুকি সম্প্রদায় আছে। তবে তারা সংখ্যায় খুবই কম। তাদের কেউ খ্রিস্টান ধর্মে পরিবর্তন হয়ে বম জনগোষ্ঠীর অংশ হয়েছে। তবে তাদের অভিযোগের জায়গাটা শুরু হয়েছে স্থানীয় অন্য বড় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।

তিনি বলেন কুকিরা মনে করে, শান্তিচুক্তি হয়েছে চাকমা ও অন্য বড় পাহাড়ি গোষ্ঠী ও সরকারের মধ্যে। এই চুক্তি থেকে আমরা কিছু পাইনি। অন্যান্য বড় গোষ্ঠীগুলো আমাদের দাবিয়ে রেখেছে। সেখান থেকে এটা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গিয়েছে। এখন তারা মনে করতে পারে যে দেশের সীমান্ত ও সীমান্তের বাইরে যে কয়েকটি স্থানে কুকিরা রয়েছে, তারা একত্র হয়ে চিন সীমান্তঘেঁষা একটা খ্রিষ্টান স্টেট তৈরি করা।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেন, আমাদের শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ কুকি-চিন নিয়ে কথা বললে হবে না। ভারতের মতো জায়গায় কুকিরা আলাদাভাবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে রেখেছে। তবে শান্তিচুক্তিতে পাহাড়িদের একাংশের সমর্থন ছিল না, তা দেখা গেছে শান্তিচুক্তির দিনই। এদের মধ্যে বিভিন্ন কারণে আস্থার একটা ঘাটতি ছিল।

Loading video

একই লেখা

Leave a Comment