Monthly Archives

May 2022

পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য নিহত হওয়ার প্রায় ৬ বছর পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে প্রিয় মাতৃভূমিতে ফেরেন বঙ্গবন্ধুকন্যা আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার আগে একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।

দেশে ফেরার পর থেকে টানা ৪১ বছর তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলছেন। এ সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন। ভূমিকা রেখেছেন সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে। পুরো সময়টাই তিনি দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে চলেছেন বিরামহীনভাবে।

ঝড়-ঝঞ্ঝাপূর্ণ দিনে (১৭ মে, ১৯৮১) দেশে ফেরার পর থেকে রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ রাস্তায় চলতে হয় স্বজন হারানো শেখ হাসিনাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দুর্যোগের মধ্যে দেশে ফিরে স্মৃতি বিজড়িত পৈত্রিক বাড়িতে ঢুকতে না পেরে আশ্রয় নিতে হয় আত্মীয়-স্বজনের কাছে। দায়িত্ব নিতে হয় পঁচাত্তর পরবর্তী ষড়যন্ত্রে খণ্ডিত আওয়ামী লীগের। পিতা-মাতা, ভাইসহ আপনজন হত্যার শোক কাটানোর আগেই পিতার হাতে গড়া দলকে সংগঠিত করায় মনোনিবেশ করতে হয় শেখ তাকে। দলের নেতাকর্মীরা ‘ঐক্যের প্রতীক’ হিসেবে শেখ হাসিনার কাঁধে আওয়ামী লীগের ভার তুলে দিয়েছিলেন, সেই ঐক্য প্রতিষ্ঠায় মাঠে নেমে পড়েন তিনি।

সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের ঘোষণা— ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ এবং ‘আই উইল মেক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট ফর পলিটিশিয়ানস’, জেল-জুলুম-হুলিয়া, গুম-খুন ইত্যাদি নৈমিত্তিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দলকে সংগঠিত করতে শুরু করেন শেখ হাসিনা। এ কাজে কখনও নৌকায়, কখনও ভ্যান-রিকশায়, আবার কখনও কাদামাটির পথ ভেঙে ছুটে গেছেন দেশের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে। দেশে ফেরার পর তার নেতৃত্বে সামরিক শাসনবিরোধী দুর্বার গণআন্দোলন সংগঠিত হয়। সেদিন ঐক্যের প্রতীক হিসেবে শেখ হাসিনাকে দলের যে কঠিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, গত ৪১ বছর সেই ঐক্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। এ সময় দু’চারবার দলের ওপর চরম আঘাত এলেও টলাতে পারেনি বঙ্গবন্ধুকন্যাকে।

দেশে ফেরার পর তৎকালীন সামরিক শাসকের নির্দেশে ১৯৮৩-এর ফেব্রুয়ারিতে প্রথমে কারান্তরীণ হতে হয় তাকে। এরপর ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি এবং নভেম্বর মাসে তাকে দু’বার গৃহবন্দি করা হয়। ১৯৮৫ সালের ২ মার্চ তাকে আটক করে প্রায় ৩ মাস গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে তিনি ১৫ দিন গৃহবন্দি ছিলেন। ১৯৮৭ সালে ১১ নভেম্বর তাকে গ্রেফতার করে তারই স্মৃতি বিজড়িত ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে একমাস অন্তরীণ রাখা হয়। ১৯৮৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনা গ্রেফতার হয়ে গৃহবন্দি হন। ১৯৯০ সালে ২৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধু ভবনে অন্তরীণ করা হয়। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে গ্রেফতার করে সংসদ ভবন চত্বরে সাবজেলে পাঠায়। প্রায় এক বছর পর ২০০৮ সালের ১১ জুন তিনি মুক্তিলাভ করেন।

শেখ হাসিনা  (ফাইল ফটো)শেখ হাসিনা (ফাইল ফটো)

এদিকে দেশে ফেরার পর ঢুকতে পারেননি পৈত্রিক বাড়িতে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরার পরদিনই ১৮ মে শেখ হাসিনা যান ধানমন্ডির বাড়িতে। তবে তাকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। পরে ৩২ নম্বরের মূল ফটকের সামনে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ আদায় করেন এবং মিলাদ মাহফিল করেন। ওইদিন তিনি আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘যে বাড়িতে আমি বড় হয়েছি, যে বাড়িতে আমার পিতাকে হত্যা করা হয়েছে, সেখানে আমাকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না, এ কেমন বিচার?’ ‘একদিন নিশ্চয়ই এসব অন্যায়ের বিচার হবে বলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন। শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িটি খুলে দেওয়ার জন্য এবং উত্তরাধিকার হিসেবে বাড়ির মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য আবেদন করলেও জিয়াউর রহমান সরকার তাতে সাড়া দেনটি বলে শেখ হাসিনা তার স্মৃতিচারণমূলক ‘স্মৃতি বড়ো মধুর, স্মৃতি বড়ো বেদনার’ কলামে উল্লেখ করেছেন। তবে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপতি সাত্তার ১৯৮১ সালের ২১ জুন ওই বাড়িটি বুঝিয়ে দেন বলে শেখ হাসিনা তার লেখায় উল্লেখ করেন।  তিনি লিখেছেন- ‘এই বাড়িটি যখন ১২ই জুন ১৯৮১ সালে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাত্তার সাহেবের নির্দেশে খুলে দেওয়া হলো, তখন বাড়িটির গাছপালা বেড়ে জঙ্গল হয়ে আছে। মাকড়সার জাল, ঝুল, ধুলাবালি, পোকামাকড়ে ভরা। ঘরগুলো অন্ধকারাচ্ছন্ন। গুলির আঘাতে লাইব্রেরি ঘরের দরজা ভাঙা, বইয়ের আলমারিতে গুলি, কাচ ভাঙা, বইগুলো বুলেটবিদ্ধ, কয়েকটি বইয়ের ভেতরে এখনও বুলেট রয়েছে।’

বাড়িটি ফিরে পেলেও শেখ হাসিনা তাতে বসবাস করেননি। তবে, বড়িটির নিজ তলায় দলের কিছু ঘরোয়া বৈঠক করতেন। ১৯৯১ সালে নির্বাচনের সব কাজ এ বাড়িতে বসেই করেন বলে শেখ হাসিনা তার স্মৃতিচারণে জানিয়েছেন।

দেশে ফেরার পর শেখ হাসিনা লালমাটিয়ায় ছোট ফুফু খাদিজা হোসেন লিলির ভাড়া বাসায় ওঠেন। এ সময় সরকারের রোষানলে পড়ার আশঙ্কায় বাড়িটির মালিক ব্যাংক কর্মকর্তা নূর আহমেদ তাকে চলে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তিনি লালমাটিয়ায় মেজো ফুফু আছিয়া খাতুনের (শেখ ফজলুল করিম সেলিমের মা) ভাড়া বাসায় ছিলেন এ সময়। পরে ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ড. ওয়াজেদ মিয়া বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের যোগ দেওয়ার পর ওই বছরের শেষ দিকে তাকে মহাখালীতে দুই কামরার একটা ফ্ল্যাট বরাদ্দ করেছিল কমিশন। শেখ হাসিনা সেই ফ্ল্যাটেই স্বামীর সঙ্গে থেকেছেন।

আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে বেশ কয়েকবার হামলার শিকার হতে হয়েছে শেখ হাসিনাকে। তাকে অন্তত ২২ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি সবচেয়ে নৃশংস   হামলার শিকার হন ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। ওই সময় নেতাকর্মীদের তৈরি মানববর্মে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। এদিন প্রাণ হারান ২৪ জন নেতাকর্মী। এরপরও কোনও বাধাবিপত্তি তাকে টলাতে পারেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ভয়ভীতি উপেক্ষা করে ও হুলিয়া মাথায় নিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরে এসেছিলেন। নিশ্চিত গ্রেফতার হবেন জেনেও তিনি  জনগণের কথা ভেবে করে দেশে ফেরেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলকে সংগঠিত করার পাশাপাশি দলকে চারবার ক্ষমতায় এনেছেন। বর্তমানে তার দল টানা তৃতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনা করছে। এছাড়া শেখ হাসিনা তিনবার সংসদে বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি টানা ৯ বার আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। নেতৃত্বে তিনি বাংলাদেশ তো বটেই দক্ষিণ এশিয়ার সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। তিনি বিশ্ব নেতৃত্বে পরিণত হয়েছেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আজ ঐক্যবদ্ধ। অতীতের যে কোনও সময়ের চেয়ে দল এখন বেশি শক্তিশালী। দলের জন্য তিনি এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছেন।

শত বাধা-বিপত্তি এবং হত্যার হুমকিসহ নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা ভাত-ভোট এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য অবিচল থেকে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ পেয়েছে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা। শেখ হাসিনার অপরিসীম আত্মত্যাগের ফলেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।  তার শাসনামলে আর্থ-সামাজিক খাতে দেশ অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করে।  ভারতের সঙ্গে  ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি, দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সামুদ্রিক সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তি, ভারতের সঙ্গে সীমানা বিরোধের নিষ্পত্তি, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনসহ নানামুখী উন্নয়ন চলমান রয়েছে। তার নেতৃত্বে দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে। করোনা মোকাবিলায় সাফল্যের পাশাপাশি দেশের মানুষের জন্য বিনামূল্যে টিকার ব্যবস্থা করেছেন। এই ক্রান্তিকালেও তিনি কয়েক লাখ গৃহহীন মানুষকে ঘর তৈরি করে দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শেখ হাসিনা উন্নয়নশীল দেশে উন্নীতকরণ, জাতীয় আয় ও রিজার্ভ বৃদ্ধি, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা, জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের বিচারের পাশাপাশি রায় কার্যকর করা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচার সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় শেখ হাসিনা সবসময়ই আপসহীন নীতি অবলম্বন করছেন।

শেখ হাসিনা (ফাইল ফটো)শেখ হাসিনা (ফাইল ফটো)

১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে তিনি বলেছিলেন, ‘…সব হারিয়ে আজ আপনারাই আমার আপনজন। স্বামী সংসার ছেলে রেখে আপনাদের কাছে এসেছি। বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তির সংগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য আমি এসেছি। আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই। আবার বাংলার মানুষ শোষণের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হচ্ছে। আমি চাই বাংলার মানুষের মুক্তি। শোষণের মুক্তি। বাংলার দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম করেছিলেন। আজ  যদি বাংলার মানুষের মুক্তি না আসে, তবে আমার কাছে মৃত্যুই শ্রেয়। আমি আপনাদের পাশে থেকে সংগ্রাম করে মরতে চাই। স্বাধীন-সার্বভৌম জাতি হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালি জাতি রক্ত দিয়েছে। কিন্তু আজ স্বাধীনতা-বিরোধীদের হাতে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে চলেছে। ওদের রুখে দাঁড়াতে হবে।’ শেখ হাসিনা সেদিন যে অঙ্গীকার করেছিলেন, তা বাস্তবায়নে তিনি আজও নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। কাজ করে যাচ্ছেন বিশ্রামহীন, বিরামহীনভাবে।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের স্মৃতিচারণ করে ২০১৭ দলের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমি চিন্তাও করিনি কোথায় থাকবো, কোথায় উঠবো। দুটো স্যুটকেস হাতে নিয়ে ফিরে আসলাম। তখন শুধুই একটাই চিন্তা। দেশে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনতে হবে। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে।’

তার নিজের মুখেও বিশ্রামহীনভাবে দায়িত্ব পালনের কথা যেমন উঠে এসেছে, তেমনই তার কাজকর্মেও তার প্রতিফলন দেখা গেছে। ২০১৮ সালের ২১ জুলাই রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘একটা মানুষের তো ২৪ ঘণ্টা সময়। এই ২৪ ঘণ্টা থেকে আমি মাত্র ৫ ঘণ্টা নেই, আমার ঘুমানোর সময়। এছাড়া প্রতিটি মুহূর্ত আমি কাজ করি দেশের মানুষের জন্য, দেশের উন্নয়নের জন্য। এর বাইরে আমার আর কোনও কাজ নেই। আমি কোনও উৎসবে যাই না। আমি কোথাও যাই না, কিচ্ছু করি না। সারাক্ষণ আমার একটাই চিন্তা— আমার দেশের উন্নয়ন, দেশের মানুষের উন্নয়ন। সারাক্ষণ চেষ্টা করি, কোথায় কোন মানুষটা কী অবস্থায় আছে, তার খোঁজ-খবর রাখতে।’

ওই সংবর্ধনার আগে দলের এক বর্ধিত সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করতে হয়েছে। তবে সবসময় নিজের আদর্শে অবিচল থেকেছি। বাবার স্বপ্ন পূরণ করতেই হবে’ এ প্রত্যয় তার সবসময় ছিল।

২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে শেখ হাসিনার গলব্লাডারে অপারেশন করার পর চিকিৎসকরা ৬ মাসের বিশ্রামের পরামর্শ দিলেও তিনি সেই বিশ্রাম নেননি। অপারেশনের কয়েক দিন পর থেকেই তিনি রাষ্ট্রীয় ও দলীয় কাজ শুরু করেন। এমনকি ওই সময় তাকে ঘরোয়া পোশাক পরে হলেও অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেখা গেছে।

0 comment
0 FacebookTwitterPinterestEmail

বিশিষ্ট পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া বাংলাদেশের গর্ব। তাঁর অপরিসীম জ্ঞান এবং আন্তরিকতা দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় বিশেষ অবদান রেখেছে। তিনি পরমাণু বিজ্ঞানকে দেশের মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তিনি ছিলেন একজন মেধাবী বিজ্ঞানী এবং দেশের আণবিক পাওয়ার প্ল্যান্টের স্বপ্নদ্রষ্টা।

ক্ষমতার ভেতরে থেকেও কখনো ক্ষমতার অপব্যবহারের সামান্যতম সুযোগ নেননি ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া। তিনি আপন অবস্থানে থেকেই কাজ করে গেছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের রূপপুরে একটি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা, দেশের বিজ্ঞানীদের পেশাগত কাজের উৎকর্ষ বৃদ্ধির জন্য একটি বিজ্ঞান ভবন নির্মাণ করা। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, তিনি তাঁর ইচ্ছার অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি।

দেশের বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা প্রসারে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি শুধু একজন মেধাবী ছাত্র বা পরমাণু বিজ্ঞানীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন নির্লোভ, নিভৃতচারী, নীতিবান, নিরহঙ্কার, নির্ভীক, স্পষ্টবাদী, দৃঢ়চেতা, দেশপ্রেমিক, আদর্শবান, সৎ, সহজ-সরল, বিনয়ী, চরিত্রবান, যুক্তিবাদী এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন আদর্শ মানুষ। তাঁর প্রতিভার অনেক দিকই আমাদের অজানা।

১৯৬৯ সালে ইতালির ট্রিয়েস্টের আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র তাঁকে এসোসিয়েটশিপ প্রদান করে। সেই সুবাদে তিনি ১৯৬৯-৭৩ ও ১৯৮৩ সালে ওই গবেষণা কেন্দ্রে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন।

১৯৬৯ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন শহরের ড্যারেসবেরি নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরিতে পোস্ট ডক্টোরাল গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। আবার ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত তিনি তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির কার্লসরুয়ে শহরের ‘আণবিক গবেষণা কেন্দ্রে’ আণবিক রিঅ্যাক্টর বিজ্ঞানে উচ্চতর প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ভারতের আণবিক শক্তি কমিশনের দিল্লির ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। এসব আমরা অনেকেই জানিনা।

১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে তিনি পর পর দু’বার বাংলাদেশ আণবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে তিনি পর পর তিনবার বিজ্ঞানী সংঘের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চার বছর তিনি বাংলাদেশ পদার্থ বিজ্ঞান সমিতিরি সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ দুই বছর মেয়াদের জন্য ওই বিজ্ঞান সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি এসব পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন শুধু তাঁর যোগ্যতার নিরিখেই।

অগণতান্ত্রিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের কারণে তিনি কিছুদিন কারাবরণও করেন। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত পর পর দু’বার বাংলাদেশ বিজ্ঞান উন্নয়ন সমিতির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি এবং ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি পর পর দুবার দুই বছর মেয়াদকালের জন্য ওই বিজ্ঞান সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১- ১৯৯২ সালে তিনি বাংলাদেশ আণবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘেরও সভাপতি নির্বাচিত হন।

এছাড়া ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত পর পর তিনবার তিনি ‘বাংলাদেশ বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানজীবী সমিতি’র সভাপতি নির্বাচিত হন। এসব তালিকাক্রম থেকেই অনুমেয় যে তিনি কতখানি খাঁটি বিজ্ঞানী ছিলেন।

আমরা এই বিজ্ঞানীকে ততটা সম্মানিত করতে পারিনি, যতটা তাঁর প্রাপ্য ছিল। পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া আমাদের গর্বের ধন। আগামী প্রজন্মের মনে বিজ্ঞানমনস্কতা ছড়িয়ে দিতে এই বিজ্ঞানীর প্রবন্ধ-নিবন্ধ, জীবনী-কর্মকান্ড, প্রচার-প্রসার অধিকহারে পঠিত হওয়া জরুরি প্রয়োজন।

লেখক: মো. শহীদ উল্লা খন্দকার
সিনিয়র সচিব, গৃহায়ন ও গনপূর্ত মন্ত্রণালয়

0 comment
0 FacebookTwitterPinterestEmail

গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনা । তিনি  ২০০৭ সালের  ৭ মে  তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ঘোষিত জরুরি অবস্থা চলাকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা শেষে শত প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশে ফিরে আসেন ।

এর আগে আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরতে তদানীন্তন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু তিনি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে বিশ্বব্যাপী। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে তাঁর ঐকান্তিক দৃঢ়তা, সাহস ও গণতন্ত্রকামী দেশবাসীর চাপে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হয়।

পরবর্তী সময়ে ৭ মে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকায় ফিরে এলে লাখো জনতা তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানায়। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে মিছিল শোভাযাত্রা সহকারে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। দেশে ফিরে জনগণের হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় শুরু করেন নবতর সংগ্রাম।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভীতসন্তস্ত্র হয়ে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই শেখ হাসিনাকে সাজানো মামলায় গ্রেপ্তার করে। ২০০৮ সালের ১১ জুন প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁকে কারান্তরীণ রাখা হয়।

প্যারোলে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশ গমন এবং চিকিৎসা শেষে ৪ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তারপর তাঁর সাহসী ও দূরদর্শী নেতৃত্বে ব্যাপক আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়। আন্দোলনের মুখে জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় জোরপূর্বক রাষ্ট্র ক্ষমতায় চেপে বসা তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট।

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন ৭ মে উপলক্ষে প্রতিবছর আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়। কিন্তু এ বছর বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে সৃষ্ট সংকটে শেখ হাসিনার নির্দেশে সব ধরনের জনসমাগমপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিহার করে আসছে আওয়ামী লীগ।

0 comment
0 FacebookTwitterPinterestEmail